অমাবস্যা

,
প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল, ২০২২     আপডেট : ২ মাস আগে

আনোয়ার হোসেন মিছবাহ্ : *সোনা শিল্পীর ফাঁপড় থেকে বেরিয়ে আসা অনলের রঙে আজ আকাশের মাঠেও ঝুলে আছে এক ডেকছি চাঁদ।নিরিবিলি।মোলায়েম।এমন চাঁদ আরব আলীকে বড়সড় এক নাড়া দেয়।তার কেবল ই মনে হয় ডেকচির ভেতর থেকে কেউ একজন খিলখিলিয়ে হাসে।হাসিটা অদ্ভুত অথচ পরিচিত।ইচ্ছে করে ডিগ দেওয়া পায়ে উপুড় হয়ে দেখে বড়ো আলাপি,বড়ো মোহময় সে হাসি।এ হাসি এমন হাসি যা কী না তাকে সে ই ছোটবেলার ইনাতাবাদ গ্রামের কাছে নিয়ে যায়।যেখানে গাছে গাছে পাখি জিরায়।রাতের নিরালে অদ্ভুত খেলা করে বুনো শিয়াল।পানা পুকুরে কৈ মাগুরের থিয়ানো ঝাঁক মানুষের চাহিদা মিঠায়।তাড়িয়ে বেড়ায় উঠোন জুড়ে বৌচি খেলায়।একদিন বৌ,চি…চি…চি…
ডেকে দৌঁড়ে শেফালিকে ছুঁতে গিয়েই বাঁধে বিপত্তি।তাল সামালে ব্যর্থ আরব আলী সজোরে ধাক্কা মেরে বসে শেফালির কাঁধ বরাবর।এতেই পড়ে গিয়ে শেফালির বিছানা নিতে হয়।তার হাঁটুতে চোট লাগে।ছাল ওঠে শরীরের ব্যথা বাড়ে।আরব আলী মাঠে যায়।কিন্তু শেফালির বিমূখতা আরব আলীকে আহত করে।সে ছুটে যায় শেফালিদের বাড়ি।আধ শোয়া শিফালিকে বিছানায় দেখে ক্যামন জানি চোখ ভিজে ওঠে তার।সে ভেজা চোখ মুছতে মুছতেই শেফালিকে বুকের মাঝে লেপ্টে ধরে আদরের ছোঁয়া মেখে কান্না থামায়।সেদিন আহত শেফালির কাছে টের পায় ঘরোয়া পোশাকেও কেমন জানি বড়ো হয়ে গেছে শেফালি।কথায় কথায় মায়াবি তাড়না।চোখে হিসাব নিকাশের অদ্ভুত খেলাধুলা।ঠোঁটে কখনও মােনালিসা কখনও বাঁধভাঙ্গা খিলখিল হাসি।কথায় স্বরের ভারিত্ব।বুকে আগামী শিশুর ভবিষ্যৎ।কোন এক অচেনা জগতে নিয়ে যায় আরব আলীর মনো ময়দান।বেণী দোলা শেফালিকে দেখে দেখে অভ্যাসি আরব আলী সেদিন আবিষ্কার করে- এলো চুলে ভোরের শিশিরের মতোই যেনো শেফালি।যেনো এক বাটি চাঁদের পেয়ালা!তারপর থেকেই চাঁদের প্রতি তার স্বভাবি দূর্বলতা।একা একা চাঁদ দেখলেও শেফালির কথা মনে হয় তার।চোখে চোখে চাঁদ হাঁটে।হাঁটে শেফালি।তার মনে মনে গান বাজে।ঘুমে অঘুমে চষে শেফালির বুক।মনের ময়দান কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা লাগে।শেফালির স্বপ্নতেই যেনো তার পূর্ণতা।আরব আলীর নিজের বুক কে আর আপন মনে হয় না।মনে হয় তার শূন্য বুকে কেউ একজন বসে থাকে রোজ।তাকে শাসন করে।কথা পাহারায় কেঁড়ে নেয় তার হিসেবি দিন।এ যেনো এক অন্যরকম মধুর অনুভূতি। ভালোলাগার সুঁড়সুড়ি। অচেনা এক টান তাকে আপ্লুত করে রাখে।তবে কী একেই বলে-ভালোবাসা।একেই বলে প্রেম।যাকে এক দন্ড ভোলার কিংবা আঁড়াল করার চোখটিও নিজের কাছে থাকে না।
*কিন্তু কী হলো শেফালির? তিন দিন হলো আরব আলীর শেফালি নিখোঁজ।থানা,হাজত,হাসপাতাল,মাঠে-ময়দান কিংবা রিক্সার মাইকেও খুঁজে পাচ্ছে না কেউ। নিজেকে বড়ো অসহায় লাগে।এলোমেলো,নিঃস্ব লাগে সবকিছু।তার নাওয়া হয়ে ওঠে না।খাওয়া হয়ে ওঠে না।ঘুৃম থেকে শুরু করে সব কিছুই ভালো লাগা থেকে সরে যায়।সিগারেটের ব্যাগে জমে ওঠে খালি খালি বাক্স।সঙ্গী হয়ে উঠে বাক্সের মিছিল।সিগারেট টানতে টানতেই আঙুল জড়ো করে নিজস্ব বুক বরাবর।এবং দলানো আঙুল দিয়ে পিষতে থাকে পরনের শাদা শার্ট। তছনছ করতে থাকে বুকের বোতাম।খাবলা মেরে আঁচড় কাটে বুকের আয়ু পাশ।গুমরে গুমরে বলতে থাকে-অমন করে হাসিস না শেফালি!তুই হাসলে বুকের ব্যথা বাড়ে।বুকের জমিনে বয়ে যাওয়া কান্নার নদীতে ধ্বস নামে।ধ্বসের আঘাতে ঝরঝর করে পোড়া চোখের নহর।আমি তখন আমাকে ভুলে যাই।ভোলার জন্য ব্যস্থ হয়ে ওঠি;বলে বুকে পোষা শেফালির শরীর থেকে হাত সরিয়ে সিগারেটের প্যাকেটে হাত দেয়।ইদানিং শেফালি ছাড়া সিগারেট টাই তার সব।সিগারেটের টানে টানে শেফালির মুখখানাই দেখে সে!সে ই ছোট কাল থেকে ই বারো-আঠারো বয়েসে চারের ব্যবধান নিয়েই ভালোবাসা তাদের।কোথায়?কেমন আছে জানলে না হয় পাখির পাখনায় ভর করে হলেও তাকে একনজর দেখে আসতো আরব আলী।একটা একটা সিগারেটের টান তার কাছে মনে হচ্ছে যেনো শেফালির জন্যই আকুল পারা টান।
শুরুর সাথে শেষের সম্পর্ক আছে বলে সিগারেটও দোকানের জন্য টানে।সে ওঠে দাঁড়ায়।মিরাজপুর বাজার থেকে সুজাপুরকে ধরে রাখা ব্রীজের উপর উঠতে গিয়েই খাঁড়া চাঁদের আলোয় পিলার বরাবর কী যেনো একটা বড়ো বস্তুর ওঠানামা টের পায়।সিগারেটের শেষ ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এমন দৃশ্য চোখে পড়ছিলো বারবার।এখানেইতো তার ধোঁয়াটানা প্রতিদিন।চোখের মাপে চাঁদ মেপে ধোঁয়াকে শূন্যে ঠেলে দুঃখ কে চাঁদের কাছে পাঠিয়ে দিলে কেমন জানি শান্তি লাগে তার।কতো নিরিবিলি সময়েও এমন আটকে যাওয়া বস্তু চোখে লাগে নি তার। কিন্তু আজ বঁড়শির চকেটের মতো ওঠানামায় মাছের কথা,সাপের কথা,আজব কোন জীবের কথা মনে করিয়ে কেমন জানি ভীত করে তুলে তার লোমের বাকল।সে এক লাফে ব্রীজের উপর ওঠে পড়ে।কিন্তু মন তাকে পা নিয়ে বাড়ি যেতে মানা করে।ব্রীজ থেকে আরও কয়েকবার এ রকম দৃশ্য দেখে একটার পর একটা দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে পর্যবেক্ষণে মেতে ওঠে আরব আলী।কিন্তু না,অবাদ দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালানো তে বাদ সাধেন ভাড়ায় খাটা নোহা ড্রাইভার-সাদেক।তিনি আরব আলীর এমন কাঠি জ্বালানোর উত্তর তালাশি আয়োজন করে বসেন।
*একজন,দুইজন করে বাড়ির পথ ভুলে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে।দিক বেদিক থেকে আসতে থাকে টর্চের আলো।হারিক্যানের বাতি।আসে গাড়ির পর গাড়ি।
সাদেক তার নোহা কে আড়াআড়ি করে ঠিক পিলার বরাবর স্টার্ট নেন।লোকজন দেখে।দেখতে দেখতে কেউ একজন ৯৯৯ এ পুলিশ ডেকে নেয়।সাইরেন বাজিয়ে,গ্রাম মাতিয়ে ভিড় করতে থাকে পুলিশের দলও।তারা আরব আলীর কাছে পুরো ঘটনা শুনে ব্রীজ থেকে নেমে আসেন পিলার বরাবর।এ কী!এ তো দেখি-কোন বিদেশ ফেরত মানুষের বয়ে আনা লাগেজ!পুলিশের চৌকশ ইন্সপেক্টর জয়,কড়া নজরে আরব আলীকে কব্জায় নিতে ইশারায় সহযোগির সাহায্য নেন।এরপর জল থই থইয়ের অচঞ্চল পিলারের কোন থেকে উদ্ধার করে আনেন আরব আলীর দেখে নেওয়া লাগেজ।কিন্তু লাগেজটি পাসওয়ার্ডের তালাবন্ধ থাকায়
খোলায় বিপত্তি আসে।ইন্সপেক্টর তামেসি মানুষকে কাজে সুযোগদানে অনুরোধের বাঁশি বাজিয়ে ভাঙ্গার নির্দেশ প্রদান করে ঘিরে ধরেন আরব আলী কে।এবং তাকে পার্শ্ববর্তী দোকানে বন্ধী করে জবানি নিতে নিতে একজন পুলিশ কর্তা চিৎকার করে ওঠেন-সর্ব্বনাশ!স্যার তাড়াতাড়ি!দেখতে পাচ্ছি-অষ্টাদশী যুবতীর টুকরো লাশ!রুমাল পোতা মুখে শেফালির মতোই মনে হচ্ছে,যাকে আমরা ফটো নিয়ে চষে বেড়াচ্ছি।আর লাশ কী না থানা থেকে মাত্র শতেক গজের দূরে।*এদিকে অপরাধ স্থলে আরও বাড়ে ভিড়।এক এক করে চ্যানেল অ চ্যানেল আসে।টিভির ক্যামেরা আসে।আসেন সাংবাদিক।আসেন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ামত উল্লাহ ও।
*আজ প্রায় তিন দিন হতে চললো,
শেফালি নিখুঁজ।তাকে কেউ না কেউ খুন করে টুকরো টুকরো করে রেখেছে লাগেজে।সবার চোখ আরব আলীর দিকে।তাহলে কি আরব আলী ই হন্তারক?তবে কী ভালোবাসার নাম করে দেহ লোটার স্বভাবী সে?আর নয়, বের করতে হবে এর রহস্য।এবার পুলিশের লাঠি ওঠে শেফালির উঠানে।এক নিমিশেই সব বের করার তাগিদ তাদের।জেরার সাথে রাতের নিরবতায় গ্রামবাসীও ভরসার সুর মিলাতে থাকে।
পুলিশের কাজেও কমতি নেই।শরীরের সুরত হাল রিপোর্টে ব্যস্থ হয়ে পড়েন জয়িতা।লাশের এদিক ওদিক করে সহযোগিতায় হাসনা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপারটি তারা লক্ষ্য করছেন-তিন দিন পর শেফালির লাশ উদ্ধার হলেও মনে হচ্ছে টাটকা অথচ নতুন।রক্তফোঁটাও কেমন জানি স্রোতস্বিনী।কাজেই পুলিশবাহিনীকে তাৎক্ষণিক অনুমান করতে হয়-খুনের মেয়াদ বেশি দিনের নয়।নিকটবর্তী সময়ে তাকে খুন করে লাগেজ করেছে আরব আলী ই। আরব আলীর এ আস্তানা আবার অনেকের অচেনা নয়।অচেনা নয়-আরব আলীর নেশার স্বভাবটিও।এই নেশার জন্যই কতোকিছু করতে হয়েছে তার।পারলে রাস্তায় যে কারও পায়ে ধরে,
আশপাশের শার্ট,লুঙ্গি চুরি করতেও কসুর করতে দেখেনি মানুষ।কতোবার জবান বিমুখ থাকতে হয়েছে শেফালির সাথেও।তারপরও শেফালি ছিলো তার ধ্যানজ্ঞান।কিন্তু নিজের প্রেয়সির এ হেন পরিণতি তার হাতে ই!ভাবতে পারছে না গ্রামবাসী।পুলিশ ছাড়া গ্রামবাসীর মাথায়ও ঢুকছে না।তারা দেখেছে নিখোঁজের ঠিক দু দিন আগে শেফালিকে নিয়েই সুয়েব এর সাথে লাটি টানাটানিতেও কসুর ছিলো না আরব আলী।তবে কী ঘটনা অন্য জায়গায়?এমন ভাবনায় বাদ সাধে দূর থেকে দৌঁড়ে আসা সকিনার ছেলে লাবু।সে আরব আলীর ই নিতান্ত সহচর।গ্রামবাসী ধর ধর করে তাকে ও আটকে ফেলে।শপাং শপাং করে লাঠি পড়তে থাকে লাবুর পিঠে,পাছায়,নানা জায়গায়।এমন সময় পুলিশের ই বেয়াড়া কেউ ঠাস করে লাত্থি দিয়ে বসেন সরাসরি অন্ডকোষে!লুটিয়ে পড়ে লাবু।এই আন,সেই আন বলে ব্যস্থ হয়ে পড়েন সবাই।পানি দে…করতে করতেই ঠিক সাত মিনিটের মাথায় চোখ খুলে লাবু।এবার আরব আলীর দিকে এক পলক তাকিয়ে বলতে শুরু করে-আজ থেকে তিনদিন আগে শেফালির অনুরোধে ই সিগারেট কিংবা নেশা সেবনের জায়গা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম।কিন্তু আরব আলীকে না পেয়ে ফিরতি পথে আগলে ধরে সাবুর ই ভাই সুয়েব।আমি যতোবার শেফালিকে আগলে রাখি,ততোবার কিল ঘুষিতে কপোকাত করতে থাকে তারা।একসময় পেটে ছুরি চালিয়ে দেয়।লুটিয়ে পড়ি আমি।চোখে ঘনিয়ে আসে অমাবস্যার চাঁদ।হুঁশ যেতে যেতে শেফালির একটি কথাই শুধু শুনি-লক্ষী ভাই,তোমার পায়ে পড়ি।আমায় নষ্ট করো না।লক্ষী ভাই আমার।মায়ের পেটের ভা….ই!

**********************
আনোয়ার হোসেন মিছবাহ্
ইমেইলঃanwarhmisbah1970@gmail.com


পরবর্তী খবর পড়ুন : করোনায় মৃত্যুহীন দেশ

আরও পড়ুন

যে কাজে তৃপ্তি পাই

         তাসলিমা খানম বীথি : ইফতারের...

হাম রুবেলা ক্যাম্পেইন জেলা এডভোকেসি সম্পন্ন

         ইফতেখার শামীম- সারা দেশের ন্যায়...

ছাত্রদল নেতা সুমনের বড় ভাইয়ের মৃত্যুতে সদর বিএনপির শোক

         সিলেট জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আলতাফ...