“কাল দুপুর থেকে আমরা উপাস দিয়া যাইন আমরারে”

,
প্রকাশিত : ২৪ মে, ২০২২     আপডেট : ১ মাস আগে

 

গোলজার আহমদ হেলাল :
অভুক্ত ব্যক্তিকে আহার্য দেয়ার ফজিলত বলতে গিয়ে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, মানুষের কল্যাণ-সংশ্লিষ্ট যত কাজ আছে, তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম হচ্ছে দরিদ্র ও ক্ষুধার্তকে খাবার দান করা। (বুখারি, হাদিস : ১২)

গভীর রাতে পানিবন্দী মানুষের ঘরে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিতে একজন মহিলার আর্ত চিৎকার আমাদেরকে পীড়া দিয়েছে। পানিতে ভিজে সাঁতার কেটে আমরা স্বেচ্ছাসেবকরা মানুষের ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছানোর কাজ করছি। ডুবন্ত বাড়ীগুলোর দুয়ার পর্যন্ত অনেক সময় নৌকা পৌঁছানো যায় না। তাই জলে ভিজেই কাজ করতে হয় স্বেচ্ছাসবীদের। কোন কোন সময় পানিবন্দী মানুষরাই নৌকা ভিড়ার সাথে সাথেই পানিতে ভিজে এগিয়ে আসেন। প্রায় বিভিন্ন বাড়ীর আশপাশে ঝোঁপঝাড় ,গাছপালা থাকায় বহনকারীরা পরিবহন নিয়ে যথাস্থানে যাওয়া কষ্টকর হয়। তাই পানিতে ভিজে, কাঁদা মাড়িয়ে আমাদের কে একাজগুলো করতে হয়।

চারিদিকে থৈ থৈ পানি। হু হু করে বাতাস। ছল ছল পানির ঢেউ। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। রাতের ঘোর অন্ধকার। ত্রাণবাহী নৌকা পৌঁছল এক বাড়ীর পেছনে ঝোঁপঝাড়ের পাশে। স্বেচ্ছাসেবক সাঁতার কেটে দুই বস্তা খাদ্য সামগ্রী ঘরে পৌঁছিয়ে দিলেন। পরক্ষণেই একজন নারীর আর্ত চিৎকার। নেমে পড়লেন কোমর পানিতে। বললেন, আমাদেরকে দিয়ে যান।আমরা আরেক পরিবার। আমরা গতকাল দুপুর থেকে উপাস।দিয়া যাইন আমরারে। ভদ্র মহিলার কথাগুলো গভীরভাবে নাড়া দেয়। আমরা আরো জানলাম। এখানে এ পর্যন্ত সরকারী বেসরকারী কোনো ত্রাণ ই যায় নি।

আরেকটি ঘটনা দিনের বেলা ত্রাণবাহী গাড়ী নিয়ে পৌঁছলাম ঘাটে। নির্ধারিত নৌকাটি আসতে বিলম্ব হওয়ায় আমরা অপেক্ষা করছি। মিনিট দশেক পরেই বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু উপস্থিত। আমরা ঐ দুরে চারিদিকে জলবেষ্টিত বাড়ীগুলোতে যাব। কিন্তু তারা জানালো তারা সবাই ডুবন্ত বাড়ীর লোকজন। তাদের ঘর বাড়ি সহায় সম্পদ পানির নিচে। পার্শ্ববর্তী স্বজনদের বাড়ীতে তারা আশ্রয় নিয়েছেন।

আমরা স্বেচ্ছাসেবকরা কখনো জড়ো করে খাদ্য সামগ্রী কাউকে দেইনি। আমরা সকাল থেকে গভীর রাত অবধি কাঁধে করে বস্তা নিয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছি। পায়ে হেঁটে কখনো হাটু পানি, কখনো কোমর পানি, কখনো পিচ্ছিল কাঁদা মাড়িয়ে যেতে হচ্ছে। এতে করে ভলান্টিয়ার কারো পা কেটেছে, আহত হয়েছে। তারপরও কাজ থেমে নেই।প্রতিটি পরিবার প্রতিটি মানুষ খুব সমস্যায়। সচ্ছল ও অসচ্ছল সবাই বন্যায় আক্রান্ত।পানি ধনী গরীব কিছুই বুঝে না। সবাইকে আহত করে।কাছে না গেলে বুঝা বিষমদায়।

মুষলধারে প্রবল বৃষ্টি, অতি বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে হু হু করে গত ১১ মে থেকেই বন্যা। এতো দীর্ঘমেয়াদী বন্যা এর আগে কখনো হয়নি অনেকের মন্তব্য। কেউ কেউ বলেছেন ২০০৪ সালের বন্যাও এরকম ক্ষতি করেনি। পানিবন্দী অসংখ্য মানুষ।বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরে চাল নেই, ডাল নেই, মাথা গোঁজার জায়গাটুকুও নেই।

স্মরণকালের সর্বনাশা ভয়াবহ বন্যা যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যা কবলিত এলাকায় অনেক বাড়ী তলিয়ে গেছে পানিতে, কারো ঘর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কারো ঘরে হাটু পানি, কারো ঘরে কোমর পানি। আংগিনায় পানি, ডানে পানি, বামে পানি, সামনে পানি, পিছনে পানি।কারো চাল উড়ে গেছে, কারো ওয়াল-বেড় ভেঙে গেছে।কারো পানি চলে গেলে মেঝে কাঁদায় ভরপুর।

নারী-পুরুষ বয়স্করা অসহায়। ফেরেশতার মত নিষ্পাপ শিশুগুলোর মুখে যেন হাসি নেই।হাজারো পানিবন্দী মানুষের জীবনচিত্র বড়ই করুন। অচল ও নিশ্চল জীবনযাত্রা। বেঁচে থাকার অধিকারটুকু যেন নেই। নিষ্প্রভ জীবন।

এই সময়ে দুর্যোগে অভুক্ত গৃহহারা মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। ত্রাণ কার্যক্রম রাজনৈতিক কোন কর্মসূচী নয়,এটি মানবিক। আসুন, বানভাসী মানুষকে সকলে সহযোগিতা করি।

সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাটে ভয়াবহ বন্যা ও কালবৈশাখীর তীব্র আঘাতে লন্ডভন্ড জনজীবন, পানিবন্দী হাজারো মানুষ এই সময়েরই চিত্র।বিপর্যস্ত হয়েছে গ্রামীণ জনপদ, জীবন যেখানে থেমে গেছে।বাড়ীঘর ধ্বংস হয়েছে, জমির ধান তলিয়ে গেছে, মৎস্য চাষীরা পথে বসেছে, নষ্ট হয়েছে রাস্তা-ঘাট ও জনপদ।প্রাণ থাকলেও ভাতে ও পানিতে মরছে মানুষ।

আল্লাহ তায়ালা আল কুরআন এ মানবজাতির পরিচয় এভাবে তুলে ধরেছেন, তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য।

রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, ‘কোনো বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যরত থাকে, আল্লাহ তায়ালাও ততোক্ষণ তাকে সাহায্য করতে থাকেন।’ (তিরমিজি)

মানবতার সবক শেখাতে গিয়ে রাসূল (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন, আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে আহার্য দাওনি। আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে পানি দাওনি। আমি অসুখে ভুগছিলাম, তুমি আমার সেবা করনি। (কেন?)
বান্দা তখন অবাক হয়ে বলবে, হে আমার প্রতিপালক, তুমি যে অভাবমুক্ত, তুমি তো খাও না, পান কর না, তুমি কীভাবে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও অসুস্থ হতে পার?
আল্লাহ তায়ালা তখন প্রতিউত্তরে বলবেন, আমার অমুক বান্দা যে ক্ষুধার্ত হয়ে তোমার দুয়ারে হাজির হয়েছিল, তুমি তো তাকে খাবার দাওনি, তাকে দিলে আমাকে দেয়া হতো। পিপাসার্তকে তুমি পানি পান করাওনি, তাকে পানি দিলে আমাকে দেয়া হতো।

পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় মহান আল্লাহ তায়ালা গরীব, অসহায়, দিনমজুর ও মিসকিনদের খাবার দান করার কথা বলেছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, পূর্ব ও পশ্চিমে মুখ ফেরানোতে কোনো পুণ্য নেই; পুণ্য আছে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, সমস্ত কিতাব ও নবীদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলে এবং আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবেসে আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, মুসাফির, সাহায্য প্রার্থীদের ও দাসমুক্তির জন্য অর্থ দান করলে, নামাজ কায়েম করলে, জাকাত প্রদান করলে, প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা রক্ষা করলে, অর্থ সংকটে, দুঃখ-কষ্ট ও যুদ্ধ-সংকটে ধৈর্য ধারণ করলে। (মূলত) এরাই হল সত্যপরায়ণ (এবং) এরাই হল আল্লাহভীরু। (সূরা : বাকারা, আয়াত : ১৭৭)

মানব সেবায় আল্লাহর রাসূলের সাহাবিদের দৃষ্টান্তও কম নয়। নিজেরা অভুক্ত থেকে তারা অন্যদের খাওয়াতেন। একবার আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-এর কাছে এসে নিজের ক্ষুধার কথা জানালে তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি আজ রাতে তাকে খাওয়াতে পারবে?

তখন এক আনসারী সাহাবী বললেন, আমি খাওয়াব। সাহাবির নিজের ঘরেই ছিল খাবার সঙ্কট। একজন খেতে পারে এতটুকু খাবারই কেবল অবশিষ্ট ছিল।

তবুও তিনি লোকটিকে তার বাসায় নিয়ে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন,এই লোক নবীজী (সা.)-এর মেহমান। আমাদের সাধ্যমতো তাকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। স্ত্রী বলল, ঘরে যা খাবার আছে তাতো যথেষ্ট পরিমাণম নয়! তাছাড়া বাচ্চারাও ক্ষুধার্ত।

স্ত্রীর কথা শুনে সাহাবি বললেন,বাচ্চাদের না খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমি মেহমান নিয়ে খেতে বসলে তুমি ঘরের বাতি নিভিয়ে দেবে। যেন মেহমান আমি খেলাম কি খেলাম না তা বুঝতে না পারে।

পৃথিবীর বুকে মানবতার এরচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত আর হতে পারে না।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) যখনই খাবার খেতেন, সঙ্গে একজনকে নিয়ে খেতেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তার ভূঁয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, আর তারা আল্লাহকে ভালোবেসে খাদ্য দান করে মিসকিন, এতিম ও বন্দিদের। তারা বলে, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা তোমাদের খাদ্য দান করেছি, তোমাদের কাছে আমরা এর জন্য কোনো বিনিময় চাই না এবং কোনো কৃতজ্ঞতাও না।’ (সূরা : দাহর, আয়াত : ৮-৯)

অবহেলা, কষ্ট ও সীমাহীন দুর্ভোগে দু:সময় পার করছে বানভাসী মানুষ। পর্যাপ্ত রিলিফ নেই। ত্রাণ বিতরণের চেয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য বেশী।ত্রাণ সকল জায়গায় পৌঁছেও না।তারা আজ জীবন-মরণের যুগসন্ধিক্ষণে অবস্থান করছেন ।আর্থিক সংকট ও পুনর্বাসন দুইটাই একসাথে ঠায় তাদের দুয়ারে দাঁড়িয়ে।।তাই সকল বিত্তবান,প্রবাসী ভাই-বোন,সরকারী-বেসরকারী সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনসহ মাবতাবাদী প্রেমিকদের বন্যার্তদের পাশে এসে দাঁড়ানো সময়ের অপরিহার্য দাবী।


আরও পড়ুন

উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ গড়তে নৌকায় ভোট দিন

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : বাংলাদেশ কেন্দ্রীয়...

সিলেটে নারী চিকিৎসকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

         সিলেট নগরীর পশ্চিম পাঠানটুলা পল্লবী...

কাজী নজরুল ইসলামের ১২৩ তম জন্মজয়ন্তীতে র‌্যালি ও আলোচনা সভা

         বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের...