দ্রোহকালের অভিভাবক

,
প্রকাশিত : ৩১ আগস্ট, ২০২১     আপডেট : ১০ মাস আগে

আনোয়ার হোসেন মিছবাহ্ :
পাম গাছের ফাঁক গলে টিনের চালে-চালে লেপ্টে থাকা দি এইডেড হাই স্কুলের দেয়াল টপকে যে দিন পার হলাম-সে দিন কেউ একজন বললো;ছাত্র যায়!কলেজের ছাত্র।তখন বুঝলাম,কোন ক্যানভাস আমাকে ডাকছে।সে অন্যতা ক্যানভাস নয়-কিশোরকালের শহিদবেদী বেষ্টিত মদন মোহন কলেজ হয়তো।যে ক্যানভাস দিনে দিনে চেনা হয়ে ওঠেছিলো নগ্নপায়ে প্রভাতফেরিতে এসে।স্থির করে ফেলি-মদন মোহন কলেজেই হবে আপাত নোঙর।যেখানে আত্মার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠবে আমার উচ্চমাধ্যমিক জীবন।
তখন দেশকে ঘিরে চলছে রাজনৈতিক দ্রুোহকাল।রাজ্যক্ষমতা দখল করে আছে স্বৈরাচার।এবং আশকারা মশকরায় বেড়ে ওঠা ১৯৭১ সালের পরাজিত বাবা বিবিদের ডিম!কেউ কেউ মিছিলে মিছিলে।কেউ বা ছবি এঁকে এঁকে বেহায়া চেয়ার টেনে টেনে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলছে।
ক্লাস হচ্ছে,হচ্ছে,হচ্ছে না করে চলছিলো।আজ যাবো,কাল যাবো,করে মিছিলমুখি সময় কে টানছিলাম।এমন সময় পড়ার লাগাম কে টেনে ধরলেন বিজিত স্যার।একদিন মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন-ক্লাসে যাও।
আমি তাঁর কথা শুনলাম।স্বৈরাচার পতনের বজ্রমুষ্ঠি কে পকেটে ভাঁজ করে ঢুঁ দিলাম ক্লাসের দরোজায়।দেখি,কথার আসরে টোল পেতে বসে আছেন দেখে- চিনে বড়ো হয়ে ওঠা আমাদের বিজিত স্যার।অর্থাৎ অধ্যাপক বিজিত কুমার দে।তিনি কথার খৈ ভাজতে ভাজতে খৈ এর চুলায় লাকড়ি ঠেলেই মোহমায়ায় তাকালেন।আমি আনত বিনয়ে পায়ের আঙ্গুল গুনে গুনে বললাম;স্যার আসতে পারি?
সে ই শুরু।এ দিন অপুর বউকে ধরে আনলেন কোথাকার কোন বইয়ের রেক থেকে।আর এফ এ পাশ, বি এ পরিক্ষার্থী উনিশ বছরের অপু পরিচয় করিয়ে দিলো বউয়ের নাম সতের বছরের হৈমন্তী।যাকে অপু শিশির নামেই ডাকে।আর তাকে পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বইয়ের রেক থেকে!
স্যার অপুর বউকে যখন কদম ফেলে- ফেলে একফুটের স্টেজ থেকে চেয়ার ছেড়ে উঠে নেমে দোলে-দোলে ছন্দ তালে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন।তখন আমার নাকের নিচে জঙ্গলের আহবান।থুতনিতে সেলুনের ডাকাডাকি।তারপরও প্রায় সমবয়সি শিশিরের প্রেমে পড়লাম।যাকে হৈমন্তী বলে ডাকতাম!হৈমন্তী আমার স্বপ্ন বালিকা!রবীন্দ্রনাথ হলেন প্রিয় দাদু মশাই!তাইতো স্যারের পায়ে পায়ে কৃতজ্ঞতার ডালি সাজাই।ক্রমে ক্রমে অভিভাবক হয়ে ওঠেন আমার স্যার।অধ্যাপক বিজিত কুমার দে।তাঁকে চিনি বলে তাঁর বাড়িও চিনি।খুব বেশি দূরে নয় তাঁর বাড়ি।আমা হতে দূর-দেড় কিলোর কাছাকাছি।আবার দূর্গাকুমার পাঠশালায় আসা যাওয়ার পথে আব্বার হাই বিজিত!হেই মাখন!ডেকে ডেকে ঢুকে পড়া সেন্ট্রাল ফার্মেসির লাগোয়া বাড়ি সিলেট শহরের চৌহাট্রা পয়েন্টের কাছাকাছি থেকেও চেনাজানা।যে পয়েন্ট থেকে মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে সিংহবাড়ির সিংহ দরোজা।যেখানে মাথা ছুঁয়েছিলো হৈমন্তীরও দাদু মশাই!স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের।
অধ্যাপক বিজিত কুমার দে যেখানে যে কামরায় হৈমন্তী কে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন-সেই কামরা বাংলার।বাংলাভাষার।বাংলা সাহিত্যের। হাঁটতে হাঁটতে একফুটের স্টেজে উঠে নেমে স্বভাব ভঙ্গিমায় শিশিরের প্রতি অপুর হাহাকারের কথা বলেছিলেন আর আমি প্রেমে প্রেমে মশগুল হয়েছিলাম।
সেই কামরার বড়োভাই মদন মোহন কলেজ প্রতিষ্ঠা পায় ১৯৪০ সালে।অধ্যক্ষ প্রমোদ গোস্বামীর উৎসাহে গদগদ হয়ে ওঠলে বাবা মদন মোহন দাসের নামে এক বিঘা জমি আর বারহাজার টাকা তুলে দিলেন সিলেট শহরের মির্জাজাঙ্গাল নিবাসী যোগেন্দ্রচন্দ্র দাস ও তাঁর ভাই মোহিনী মোহন দাস।ব্যস!এই যাত্রা শুরু কলেজের।লাল টিনের ঘরকে বাড়িয়ে দেওয়ার মানসে সিলেটের ই বিশ্বনাথ এলাকার লন্ডন প্রবাসী ইসমাইল আজাদ চৌধুরী কলেজের পশ্চিম সীমানায় এক বিঘা জমির সাথে আরো সাত ডিসিমেল জমি ক্রয় করে দিলেন ১৯৭৪ সালে।
দিনে দিনে গড়ে ওঠলো কলেজের বড়ো আঙ্গিনা।
শ্রদ্ধা,ভালোবাসা,সম্মান,সুনজরের ক্যানভাস।এই ক্যানভাসেই আসেন আমার-ইতিটানা প্রীতির এমসি কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালের পড়ুয়া ছাত্র বিজিত কুমার দে।১৯৬৬ সালে চাকরিজীবনকে শুরু ধরে দীর্ঘ ২৭ বছর কে বগলদাবা করে ১৯৯৩ সালে অবসর নেন।
১৯৪০ সাল থেকে প্রতিষ্ঠার পর পুরুষের কলেজ নামে মদন মোহন কলেজ পরিচিতি নিয়ে জন্মালেও আমাদের ডান কিংবা বামপাশের বুকঘেঁষা বেঞ্চিতে বসে বসে স্যারের সাথে মাথা দোলাতেন হৈমন্তীর বড়ো বড়ো বোন-আমাদের সহপাঠী বালিকারাও।তারা সেই যে ১৯৭৭-৭৮ সাল সময় থেকে এসেছিলেন অদ্যাবদিও আছেন।শুধু সাবালক-সাবালিকা বদলায়,ক্যানভাস থাকে।ক্লাস বদলায়।দিনে দিনে আমরা পিতা হয়ে উঠি।সহপাঠীরা মা হয়ে উঠে।চোখ বুজলেই নুসরাত,সুজন,মিঠু,আফজল,
ফখরু,পম্পি,আশরাফ,মারুফ,ফরিদ,হলি,সাহান,
কণা,লুবনা,মুনিরা,শাহাদতদের দেখি।এরা ভাই হয়।বন্ধু হয়ে আসে।বোন হয়।মায়াবি হয়ে আসে।
আমি আবার চোখ বুজি।দেখতে পাই-১ অক্টোবর ১৯৯০ সালে অধ্যক্ষের চেয়ারে বসা বন্ধু হিরুর আব্বা অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।যার বুকে মাথা নুইয়ে আমরা কজন এরশাদ পতনে মালা নিয়েছিলাম।চোখ বুজে দেখি,লাটি হাতে এখনও কি না
দাঁড়িয়ে আছেন-সিংহ পুরুষ অধ্যাপক প্রনব কুমার সিংহ।
যিনি বন্দুকের ময়দানেও লাটি হাতে মায়াময় কোমল কঠিনে পাহারা দিতেন।
আজ মজা পুকুরের জারমনিপানা সরিয়ে সরিয়ে গোসল করার মতো স্মৃতি ঠেলে বার বার স্যারের কাছেই আসি।কাছে আনি-আমার ৪৫ মিনিট করে ক্লাসজীবনের আরেক জনপ্রিয় এবং ঝরনার কলকল কোলাহলে জমিয়ে ক্লাস পরিচালক সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল ফতেহ ফাত্তাহ স্যার কে।যার স্নেহ সুর,স্মরে আজও আছি সুমিষ্ট ছায়াতলে। কারন দুজনেই পড়াতেন বাংলা।বাংলাসাহিত্য।
একজন গট গট করে পায়ে হাঁটা জমিলার কথা বলতেন।অন্যজন শোনাতেন-
“কোথায় স্বর্গ,কোথায় নরক কে বলে তা বহুদূর?
মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক,মানুষেতে সুরাসুর।
রিপুর তাড়নে যখনই মোদের বিবেক পায় গো লয়,
আত্মগ্লানির নরক অনলে তখনই পুড়িতে হয়।
প্রীতি ও প্রেমের পূণ্য বাঁধনে যবে মিলি পরষ্পরে,
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরই কুঁড়ে ঘরে।”
অথবা
নানা ধর্মে বিভাজিত লাল লাল রক্তের মানুষকে মিলাতেন এভাবে-
“নানান বরন গাভীরে ভাই
একই বরণ দুধ
জগৎ ভরমিয়া দেখলাম
একই মায়ের পুত-
বংশে বংশে নাহিকো তফাত
বনেদি কে আর গর-বনেদি,
দুনিয়ার সাথে গাঁথা বুনিয়াদ
দুনিয়া সবারিজনম বেদি।
সে ইতো আমার বিজিত স্যার
১ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ থেকে সু্তো টেনে ধরলে আজ তিনি ৮৮এর ঘরে।তিনি নজরুলকে নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে অনেক দূুর যাবেন এ আমার বিশ্বাস।তিনি তাঁর বয়েস কে বাড়িয়ে সীমানা ছাড়িয়ে।দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ (১৯৭৭),শ্রী হট্ট প্রদীপ(১৯৮২),গল্পে কথামৃত(১৯৮৪),গীতা সারসংক্ষেপ(২০১৩) এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি(২০০৪) দিয়ে যুগে যুগে শ্রদ্ধাঞ্জলি নেবেন।আমাদের। পাঠকের।ছাত্রের।সে ই দিন ইলাস্টিক হোক,এই হিতেচ্ছায় নতজানু আছি আজও।

———————————————

১ সেপ্টেম্বর
প্রিয় শিক্ষক-অধ্যাপক জনাব,বিজিত কুমার দে
স্যারের জন্মদিন।
স্যারের জন্মদিন বছর বছর ঘুরে আসুক।
এ প্রত্যাশা নিয়ে দু কলম!


আরও পড়ুন

রোবো রেসিংয়ে লিডিং ইউনিভার্সিটি চ্যাম্পিয়ন

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: রোবো রেসিং...

সাবেক মেয়র কামরানের মৃত্যুতে আওয়ামীলীগ নেতা মতিউর রহমান মতি ‘র শোক

         সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র,...

মালয়েশিয়া বিমানবন্দরে ভোগান্তিতে বাংলাদেশিরা

         মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে ফিরতে প্রবাসীদের...