বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সিলেটের ছোট ও মাঝারি খামার

Alternative Text
,
প্রকাশিত : ০৬ জুন, ২০২২     আপডেট : ৩ সপ্তাহ আগে

নুসরাত হাসিনা একজন নারী উদ্যোক্তা। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। কিন্তু কয়েক বছর আগে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করেন। সিলেট শহরতলির চাতলীবন্দ গ্রামে গড়ে তোলেন হালিমা অ্যান্ড হাসিনা এগ্রো ফার্ম। সম্প্রতি গোখাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় দুই বছরের মাথায় এসে তার খামারটি এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শুধু নুসরাত হাসিনা নন, গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সিলেটের সহস্রাধিক খামারি এমন বিপাকে পড়েছেন। অনেকেই নতুন করে খামারে গরু তুলছেন না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেকেই আবার খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সিলেটের খামারিরা সভা করে দুধের দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভোক্তা পর্যায়ে।

সিলেটের গোখাদ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক বছরের মধ্যে দ্রুততম সময়ে অস্বাভাবিক হারে গোখাদ্যের দাম বেড়েছে। গত বছর ৩৫ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা গমের ভুসি বিক্রি হতো ১ হাজার ৪৩০ টাকায়। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০ টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে বস্তাপ্রতি প্রায় ৬২০ টাকা। গেল বছর ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা লবণ বিক্রি হতো ৬০০ টাকায়। এবার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০ টাকায়। এক বছরে প্রতি বস্তায় দাম বেড়েছে ৪৫০ টাকা। গেল বছর ৭৭৫ টাকায় এক বস্তা ফিড পাওয়া গেলেও বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০ টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে প্রতি বস্তা ফিডের দাম বেড়েছে ২৪৫ টাকা। গেল বছর প্রতি বস্তা ভুট্টা বিক্রি হতো ১ হাজার ৩০০ টাকায়। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। দাম বেড়েছে বস্তাপ্রতি ৬০০ টাকা। ৫০ কেজি ওজনের ১ হাজার ৭০০ টাকা দরের মিক্সার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকায়। দাম বেড়েছে ৩০০ টাকা। ৪০ কেজি ওজনের রাইস পলিশ বা আটা কুঁড়া ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০০ টাকায়। এক বছরে দাম বেড়েছে ৩০০ টাকা।

গোখাদ্যের এমন অস্বাভাবিক মূলবৃদ্ধির ফলে খামারিরা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছেন। সিলেটে সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নিজেও একজন খামারি। শহরতলির ভাটা এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন বিশাল একটি খামার। তাতে রয়েছে কয়েক শ’ গরু। দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার খামারের রয়েছে ব্যাপক সুনাম। গোখাদ্যের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শুক্রবার রাতে সিটি মেয়রের বাসভবনে সভা করেন সিলেটের খামারিরা। সভা থেকে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে খামারিরা পাইকারি দুধের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। পাইকারি দামে প্রতি লিটার দুধ ৭০ টাকা ও খুচরা ৯০ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

তাসফিয়া ডেইরি ফার্মের স্বত্বাধিকারী মখলিছুর রহমান কামরান। তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও। তিনি জানান, গত তিন মাস ধরে গোখাদ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এ কারণে তারা চরম সংকটে রয়েছেন। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি খামারও বন্ধ হয়ে গেছে। দামের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে আগামী তিন মাসে সিলেটের অধিকাংশ খামার বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা এ খামারির।

খামারে একদিনের উৎপাদিত দুধ বিক্রি করে ওই দিনের গরুর খাবার ও শ্রমিকের বেতন দেয়া যায় না বলে জানান খামারি কালাম হোসেন। তিনি বলেন, বাড়তি খরচ মেটানোর জন্য গরু বিক্রি ছাড়া কোনো বিকল্প অনেকের হাতে থাকে না। দাম বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে খামার পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় খামারিরা অসহায় পড়েছেন।

সিলেট জেলায় ছোট-বড় প্রায় এক হাজার খামার রয়েছে। এ অঞ্চলে কাঁচা ঘাসের উৎপাদন কম। যে কারণে বাজার থেকে কেনা দানাদার জাতীয় গোখাদ্য ছাড়া বিকল্প খাবার তেমন থাকে না। এজন্য বাজার থেকে দানাদার খাবারের বিকল্প বের করার তাগাদা দিচ্ছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে সিলেট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রুস্তুম আলী বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ আন্তর্জাতিক কারণে দানাদার খাদ্যের দাম বাড়ছে। এ অবস্থায় পতিত জমিতে ঘাস চাষের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। পাশাপাশি বর্ষায় পানি শুকানোর পর এ অঞ্চলের জমিতে মাষকলাইর চাষ করা যেতে পারে। দানাদার খাদ্যের ওপর নির্ভরশীলতা না কমালে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

গোখাদ্যের দাম কমালে খামারিদের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও লাঘব হবে বলে মনে করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে খামারিরা চরম বিপাকে। এখনই এ গোখাদ্যের দাম না কমালে খামারিরা চরম দুর্ভোগে পড়বেন। ফলে উৎপাদিত দুধ তৃণমূল খামারিরা ভালো দামে বিক্রি করতে পারবেন না। সাধারণ মানুষের জীবন-যাপনে এর প্রভাব পড়বে। সুত্র- নূর আহমদ, সিলেট বর্ণিক বার্তা


আরও পড়ুন

হাওরে পানির চাপ ক্রমশ বাড়ছে

         বোয়ালিয়াসহ অনেক হাওরের ফসল রক্ষা...

আমন ধানের বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি

         মোঃ জামাল হোসেন লিটন, চুনারুঘাট...