মহররমের তাৎপর্য ও গুরুত্ব

,
প্রকাশিত : ২১ আগস্ট, ২০২১     আপডেট : ১০ মাস আগে

বেলাল আহমদ চৌধুরী::
মহামহিমান্বিত হিজরী সনের বর্ষ শুরু মাস হিসাবে মহররম মাসকে কেন নেয়া হলো? বর্ষ শুরু মাস হিসাবে মহররমকে নেয়ার কারণ কী? নবী করিম (স:) এর হিজরতের মাস হিসাবে রবিউল আওয়ালকে কেন প্রথম মাস করা হলো না? তাছাড়া আরবী বারো মাসের মধ্যে রমজান মাস ব্যতিত মহররম মাসকে কেনই বা বাছাই করা হলো, এর যুক্তি কী? এতদসংক্রান্ত কিছু তথ্য উপাত্ত হিজরী সনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায়, হযরত ওমর ইবনে খাতাব (রা:) খেলাফতে অধিষ্টিত হলে ইয়েমেনের শাসনকর্তার কাছে একটি অনুজ্ঞালিপি প্রেরণ করেন। কিন্তু; প্রেরিত অনুজ্ঞায় শুধু মাত্র ‘শাবান’ মাসের উল্লেখ ছিল। ইয়েমেনের শাসনকর্তা আবু মুছা আশআরী এই অনুজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করে মহামান্য খলিফা ওমর বিন খাত্তাব (রা:)-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সবিনয়ে তারিখ বিহীন অনুজ্ঞা কার্যকরী করণের পথে অসুবিধা ও বিপত্তি উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় অবগতি ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আকুতি প্রকাশ করেন। তিনি মহামান্য খলিফার কাছে জানতে চান যে, দিন-তারিখ ও সনের উল্লেখ না থাকায় অনুজ্ঞা পত্রটি কার্য্যকরী কবে থেকে কখন করতে হচ্ছে তা পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে না বলে প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। পত্রে উল্লেখিত শাবান মাসটি গত বছরের না-কি বর্তমান বছরের ইত্যাদি নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক হয়। মহামান্য খলিফা এই পত্র পেয়ে মজলিশ-উশ-শুরার বৈঠক আহ্বান করেন। সমাগত সম্প্রদায় প্রধানদের অনেকেই নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত সনকে ‘ষ্ট-এরা’ বা রাজকীয় সন হিসাবেই সন গণনার সুপারিশ করেন। তবে কখন বছর গণনা করা হবে এ প্রশ্নে কেউ বলেন নবীজীর জন্ম সাল থেকে, কেউ বলেন নবুওয়াত লাভের বছর থেকে আবার কেউ বলেন নবীজীর হিজরতের বছর থেকে। পরিশেষে হিজরতের পক্ষে হযরত আলী বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা:)-এর পরামর্শক্রমে মহানবী (সা:) এর মক্কা মোকাররমা থেকে মদীনা মনোয়ারা হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষিতে হিজরী সন প্রচলিত হয় এবং হযরত ওসমান বিন আফফান (রা:) এর পরামর্শক্রমে মহররম মাসকে প্রথম মাস এবং জিলহজ্ব মাসকে শেষ মাস হিসাবে স্থির করে হিজরীসন গণনা রীতি প্রচলনের পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
মহররম মাসের অভিধানিক অর্থ হলো হারাম বা নিষিদ্ধ মাস। এ মাসে আরবরা কোন ধরণের যুদ্ধ বিগ্রহ করত না। তারা এ মাসে রক্তপাত থেকে বিরত থাকত। নিষিদ্ধ মাস চারটি মাসকে মহান আল্লাহ পরম সম্মানিত ও মর্যাদা সম্পন্ন বলে কোরআন মজীদে উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো : মহররম, রজব, যিলকদ ও যিলহজ্ব। আল কোরআনে এরশাদ হয়েছে-আসমান ও জমিন সৃষ্টির সময় থেকেই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্য ১২ মাস। এর মধ্যে চারটি হলো সম্মানিত মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠি বিধান। সুতরাং তোমরা এ মাসের সম্মান নষ্ট করে নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। সুরা তাওবা আয়াত ৩৬ রমজান মাসের পর সর্বোত্তম রোজা হলো মহররমের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ। সহিহ মুসলিম হাদিস : ৭৪৭
মহররমের তাৎপর্য গুরুত্ব ও ফজিলত অনেক বেশী যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
১। মহান আল্লাহপাক দশই মহররম ‘ল ও হে মাহফুজ’ ও প্রাণীকুলের রূহ সৃষ্টি করেন। ২। এই মাসে হযরত মুছা (আ:) ও তার অনুসারিদেরকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে আল্লাহপাক মুক্তিদেন এবং ফেরাউন নীল নদে সদলবলে পানিতে ডুবিয়ে মারেন। ৩। এই মাসেই হযরত নুহ (আ:) এর নৌকা জুদ্বী (তুর) পর্বতে আশ্রয় নিয়ে ছিল। নাজাত প্রাপ্তির পর হযরত নুহ (আ:) শুকরানা রোজা রাখেন। ৪। এ মাসে হযরত ইব্রাহীম (আ:)-কে ‘খলিল’ উপাধি দান করা হয়। হযরত ইব্রাহীম (আ:)-এর জন্ম এবং তিনি এ মাসে নমরুদের অগ্নিকুন্ড থেকে রক্ষা পান। ৫। হযরত দাউদ (আ:)-এর কসুর মাপ হয় এ মাসেই। ৬। হযরত সুলাইমান (আ:) রাজত্ব ফিরে পান এ মাসেই। ৭। এ মাসেই হযরত আয়‚ব (আ:) পীড়া থেকে আরোগ্য লাভ করেন। ৮। হযরত ইউনুছ (আ:) ৪০ দিন পর এ মাসেই মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভ করেন। ৯। এ মাসেই হযরত ইয়াকুব (আ:) তদ্বীয় পুত্র হযরত ইউছুফ (আ:) কে ফিরে পান। ১০। এ মাসেই হযরত ঈসা (আ:) ইহুদীদের হাত থেকে রক্ষা পান। ১১। এ মাসেই হযরত ইদ্রিস (আ:) কে উর্দ্ধজগতে নিয়ে উচ্চ মর্যাদা দান করা হয়। ১২। নবী করীম (স:) এ মাসেই বিবি খোদেজাকে বিবাহ করেন। ১৩। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগেই এ মাসে রোজা ওয়াজিব হয়েছিল। ১৪। এ মাসেই হযরত আদম (আ:) কে সৃষ্টি করা হয়। ১৫। মহান আল্লাহতায়ালা দশই মহররম লাওহে মাহফুজ ও প্রাণীকুলের রূহ সৃষ্টি করেন এবং পৃথিবীর সমস্ত নদ-নদী, পাহাড় পর্বত, সাগর মহাসাগর ইত্যাদি সৃষ্টি করেন। ১৬। এই মাসে শুক্রবারে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছানুযায়ী কিয়ামত সংঘটিত হবে।
এ মাসেই ‘আশুরা’ পালন করা হয়। আশুরা শব্দটি এসেছে আরবী বা অশর থেকে। আশুরার শাব্দিক অর্থ দশম বা দশমী। হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর ওফাতের ৫১ বছর পর কারবালার বেদনাবহ ঘটনা ঘটেছে। আশুরার দিনের মর্যাদা, তাৎপর্য ও গুরুত্ব ইসলাম প‚র্ব যুগ থেকে চলে আসছে। অনেকে আশুরার দিন বলতে কারবালার প্রান্তরে নবীজি (সা:) এর প্রিয় দৌহিত্র হুসাইন (রা:) ও তাঁর পরিবারের মর্মান্তিক শাহাদতের ঘটনা বুঝে থাকে। অনেকের ধারণা, কারবালার ঘটনার কারণে আশুরার দিনের এত মর্যাদা ও ফজিলত। আসলে আশুরার দিনে কারবালার ঘটনা সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি কাকতালীয়। নবী করীম (স:) বলেছেন, আমার সুন্নত অবলম্বন কর এবং আমার পর খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নত অবলম্বন কর। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত খোলাফায়ে রাশেদার প্রতিষ্ঠিত নীতি লংঘন পদদলিত করে ইয়াযিদকে মুসলিম জাহানের শাসক নির্বাচন করা হয় এবং খেলাফতের পরিবর্তে রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ইয়াযিদ ইসলাম বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত হন এবং রাষ্ট্রীয় আমানত ও মুসলমানদের জাতীয় সম্পদ বায়তুলমাল ব্যক্তিগত সম্পদ হিসাবে ব্যবহার শুরু করেন, শুধু তাই নয়, মুসলিম জাহানের খলিফা হিসাবে তার হাতে ‘বায়আত’ গ্রহণের জন্য হুসাইন (রা:)-এর পর চাপ সৃষ্টি করে। নবী করীম (স:) দৌহিত্র হুসাইন (রা:) ‘আমর বিল মারূফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার’ তথা ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধের মহান দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে বায়আত গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন এবং মহানবী (সা:) ও খোলাফায়ে রাশেদার সুমহান আদর্শ প্রচার শুরু করেন এবং মৃত্যুকে নির্ঘাত জেনেও মদিনা থেকে মক্কায় ও মক্কা থেকে ক‚ফায় রওয়ানা হন এবং কারবালার প্রান্তরে ইয়াযিদ বাহিনীর সাথে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদতের অমীয় সুধা পান করেন।
ফিরে এলো আবার সেই মহররম মাহিনা, ত্যাগ চাই। মর্শিয়া ক্রন্দন চাই না বরং অন্যায় অসত্য ও বাতিলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে আত্মত্যাগের মাধ্যমে হযরত হুসাইন (রা:) যে উজ্জ্বল ও মহান আদর্শ স্থাপন করে গেছেন আজকের মুসলিম জাহানে বা মিল্লাতে সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। পরিশেষে বলব মহান আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘সত্য সমাগত, মিথ্যা বিলুপ্ত, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হবেই।” সুরা বনী ঈসরাইল-১৭/৮১।
লেখক : কলামিস্ট।


আরও পড়ুন

ফাইজারের করোনার টিকা আসছে

         দেশে আরও ২৫ লাখ ডোজ...

“রাসূল (সা) আমার ভালবাসা” ঈমান তাজা ও মজবুত করার মত গ্রন্থ

         মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন: বিশিষ্ট লেখক...