রাতারগুল স্বপ্ন ছোঁয়ার ঠিকানা

,
প্রকাশিত : ০৭ মে, ২০২২     আপডেট : ২ মাস আগে

মোয়াজ আফসার :
ট্রেন মিস করা ষ্টেশনের যাত্রীর মতো মনটা বেজার করে বসে আছে আনিকা হৃদি আমার ইঞ্জিনিয়ার মেয়েটি। ওর চাচু ঢাকা থেকে ঈদে সিলেট আসছে না এবার ভ্রমনে নানান বিড়ম্বনার কথা ভেবে। বাসে-ট্রেনে টিকিট মেলে না ট্রাফিকজ্যাম হুড়োহুড়ি-মারামারি এসব আর ভাল্লাগেনা। তাই এ সিদ্ধান্ত। আনোয়ারের রুঢ় এ সিদ্ধান্তে ঈদ আনন্দের ভিত নাড়িয়ে দেয় ভ্রাত্রিজায়া পরাগ আর সন্তান দু’টো আনিশা আইয়ানের। আনিশার মনটাও খুব খারাপ তাই। এবারকার ঈদ তবে উড়িরচরের মতো বন্যার তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে! না শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা যায়নি। এর রঙ বদল হয়। মেয়ে দু’টোর ভাঙ্গা মন জোড়া দিতে ভ্রমনের কষ্টটা শাওয়ালের চাঁদে হয় বিলিন। ওরা বাড়ি আসে।
ঈদের আগের সন্ধ্যা নামে আমাদের ঘরে আমোদে এক রজনী হয়ে। ‘শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেছে আগামীকাল ঈদ’ টেলিভিশন স্ক্রিনে ভেসে ওঠা টাইটলের সাথে সাথেই বেজে ওঠে রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। গানের সাথে সাথে আকতারের রঙ্গ করা নৃত্য আর তাতে এ সংসারে ঘর বাঁধতে আসা অন্য ঘরের ললনারা ফাহমিদা, মম আর পরাগের মনেও দোল ওঠে। সবচে’ আনন্দের রোশনাই ছড়ায় আমাদের সন্তানদের হৃদয়ে। আমার ছেলেমেয়ে হৃদি রিজভী আকতারের নাবিহা নাফিসা আনোয়ারের আনিশা আইয়ানের। এ আনন্দ ওরা পুঁজি করে রাখে আরেক ঈদ পর্যন্ত। এটি কয়েক বছর ঈদের আনন্দে আমাদের সবচে’ আকর্ষণীয় একটি পর্ব। এ উজ্জ্বল রাত সন্তানদের ভেতর এমনভাবে দাগ কেটেছে এটিই হয়ে উঠেছে ঈদের মূল উৎসব। অনলাইনে যোগ দেন বিদেশের আত্নজরা। যোজন যোজন দূরত্ব মুহূর্তে ঘুঁচে যায় সেলফোনের কারিশমায়। সবার সামিলে এখানে খুশির নহর ছোটে অবিরল রঙ্গের ধারায়। এ খুশি অমর থাকুক যুগযুগ।
চাঁদ রাতে এক বৈঠক বসে ঘরে। এজেন্ডা ঈদের পর কোথায় বেড়ানো যায়। স্থানটি হতে হবে শহর থেকে কাছের দর্শনীয় কোলাহল মুক্ত। আলোচনায় রাতারগুল উঠে আসে শীর্ষ মতামতে। কিন্তু চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ঝুঁকিতে পড়ে। আমার ভ্রাত্রিবধূ রাজবাড়ি ফরিদপুরের মেয়ে পরাগ ওর ছেলেমেয়ে দু’টো নিয়ে ওখানে নৌকায় চড়বে না। পানিতে ওর ভয়। দিনকয়েক আগে সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ড থেকে স্টিমারে বাংলাদেশের মানচিত্রে দক্ষিণের শেষ প্রান্ত ছেঁড়া দ্বিপ যাচ্ছিলো। মাঝ দরিয়ায় হঠাৎ স্টিমারের প্রপেলার পানির নীচে ভেসে যাওয়া একটা জালে প্যাচ খেয়ে আটকে যায়। আর আগায় না। মাঝ দরিয়া। পানি আর পানি। অন্য কিছু নজরে পড়ে না। জলের উন্মত্ত ঢেউ যেন বিষধর সাপের ফণা তুলে। যাত্রীদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। নাবিক বহু চেষ্টায় ব্লেড দিয়ে জাল কেটে তবেই স্টিমারটি সচল করে বেশ খানিক সময়ের চেষ্টায়। দুঃস্বপ্নের সে যাত্রা তাড়ায় এখনও। তবু সবার আগ্রহে দায়ের কোপ বসাতে চায়নি। নৌকা চড়ুক কিংবা নাইবা উঠুক স্মৃতির ডাইরিতে তো রাতারগুল দর্শনের একটা পালক সেটে দেয়া যাবে। ঢাকায় লোকমুখে গল্প শুনতে শুনতে এবার নাহয় অধরা স্বপনটা নিদেনপক্ষে ছুঁয়ে দেখার স্বাদ পাবে। ঈদের তৃতীয়দিন বারোজনের পারিবারিক ট্রুপ নিয়ে শহর ছেড়ে ছুটলাম ছাব্বিশ কিলোমিটারের দূরত্বে আমাদের স্বপ্ন ছুঁয়ার ঠিকানা রাতারগুল।
বৃষ্টিতে ভেজা চা গাছগুলো যেন সদ্য যৌবনা কিশোরী। বৃষ্টির পানিতে গোসল সেরে তার চির চেনা মায়াবী সৌন্দর্যে মুগ্ধ করছে মানুষের চোখ, অপরুপ সাজে সাজিয়ে তুলছে আমাদের এই পৃথিবী। মাথার ওপর ছায়া বৃক্ষগুলো মায়ের মমতায় গাছগুলোকে যেন লালন করে। তাকালে অনেক সময় ভ্রম হয়। মনে হয় যেন মাটিতে বিছানো এক সবুজ গালিচা। এর মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে সিলেট বিমান বন্দর সড়ক। এই পথ দিয়ে আমাদের হাইএসের তরুন চালক জুনায়েদ গাড়ি ছুটায়। দুপুর সাড়ে বারোটা। মালনীছড়া পার হয়ে ধুপাগুলের রাস্তায় যেতে যেতে চোখে পড়ে ট্যুরিস্ট পুলিশের স্লোগান লেখা অনেকগুলো সাইনবোর্ড। একটি স্লোগান ‘ঘুরে দেখি নিজ দেশ কি সুন্দর বাংলাদেশ’ আমাকে বেশ খানিক আলোড়িত করে। সত্যিই এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।
সোয়া একটায় ঘাটে পৌঁছে দু’টো ছিপ নৌকা ভাড়া করে একেকটিতে আমরা ছ’জন করে বসি। ভাবনা ছিলো মাঝি কেমন হয়। তরুন চঞ্চল মাঝি দু’জনের বিমুগ্ধ ব্যবহার আমাদের বেশ আশ্বস্ত করে। নির্ভাবনায় আমরা নৌকায় বসি। মাঝি বৈঠা ধরে। রাতারগুলের মূল জায়গায় যেতে ছোট্ট একটা ক্যানেল পার হতে হয়। ওই ক্যানেল ধরেই রাতারগুল জয়ের পথে আগাই। ক্যানেলের পারে জারুল গাছের সারি। ফুটেছে ছোট ছোট ল্যাভেন্ডার রঙয়ের ফুল। দমকা বাতাসে গাছের ছোট ছোট ফুল নৌকায় আমাদের ওপর ঝরে পড়তে থাকে। যেন রাতারগুলের পথে আমাদের সুস্বাগতম। দশ মিনিটের মতো সময় খরচ করে পাড়ি দিতে হয় এই ক্যানেল। ক্যানেলের শেষ প্রান্তে এসে আমরা নামি। এ জায়গাটা ছোট্ট একটি জংশন। দু’ মিনিট হেটে ওপারে অপেক্ষারত নৌকা। বেশ কিছু বিদেশি পর্যটকের সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যায় এখানে। আগ বাড়িয়ে একটু কথা বলে নিই। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে কথা বলে। ওরা এসেছে ফ্রান্স থেকে। বাংলার রুপ দেখে ওরা অভিভূত। এই সুযোগে আমার মেয়ে আনিকা হৃদি সেলফোনে একটা ছবি আটকে রাখে। এখান থেকে শুরু রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট। পৃথিবীতে দেখা পাওয়া মাত্র ২২টি জলাবনের একটি। ভারতীয় উপমহাদেশে আর একটি আছে শ্রীলংকায়।
শুরুতেই বিমুগ্ধতা। রুপশী রাতারগুলকে দেখে এর সৌন্দর্য লিখে প্রকাশ করা একেবারেই অসম্ভব। যেন একটা ছবি। এটা কেবলই অনুভবের,একান্তই নিজের। ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে।’ এটি নিজের ভেতর গুঞ্জরিত হয়, হৃদয়ে বাঁজে। প্রকৃতির উজাড় করে দেয়া এমন সৌন্দর্য রাতা আর করচ গাছের পানির সাথে মিতালি। আমাদের মাঝি নিয়ামতকে জিগ্যেস করলাম ছবি তুলে দিতে পারবে কি না। এমনভাবে ও মোবাইলটা হাতে নিলো মনে হলো মনে মনে আওড়াচ্ছে বেটা কি কয়! তুলে দিলো ছবি। সত্যিই প্রফেশনালদেরও হার মানায়। রাতারগুলে রাতাগাছ নামে একধরনের উদ্ভিদের দেখা মেলে। স্থানীয় ভাষায় এটি মুর্তা নামে পরিচিত। এই উদ্ভিদই নাম দিয়েছে রাতারগুল। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি তৈরি হয় এই গাছের বেত দিয়ে। রাতারগুলে সবচেয়ে বেশি জন্মায় করচ গাছ। করচ ঘন ডালপালা বিশিষ্ট বহু বর্ষজীবী বৃক্ষ। অনেকটা বট গাছের মতো। করচের তেল জ্বালানি, লুব্রিক্যান্ট, সাবান কারখানা, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পেইন্টিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। বাতের ব্যথা, চর্মরোগের ওষুধ হিসেবের তেল ব্যবহার হয়ে থাকে। করচের তেল এবং শুকনো পাতা পোকামাকড় দমনের জন্য ব্যবহৃত হয়। করচের খইল পোল্ট্রি ফিড হিসেবে ব্যবহার হয়। এছাড়া খইল মাটিতে প্রয়োগ করলে মাটির উর্বরতা বাড়ে এবং নেমাটোডের বিরুদ্ধে কাজ করে। এ ছাড়াও বায়োগ্যাস উৎপাদনের জন্য খইল গোবরের চেয়ে উত্তম উপাদান বলে অনেকে মনে করেন।
করচ গাছগুলো ওদের শিকড় বাকল পানিতে এমনভাবে ছড়িয়ে রেখেছে হঠাৎ সাপ ভেবে আতকে উঠতে হয়। মাথার ওপর তাকালে বিজলি চমকানোর পর আকাশে যে আঁকাবাঁকা রেখা ফুটে ওঠে গাছের শাখা প্রশাখা এরকমভাবেই আকাশ ঢেকে রেখেছে। এর ফাঁকে কিছু কিছু আসমান দেখা যায়। এ দৃশ্য যে কাউকে মাতাল করে দেবে। কিছুক্ষণের জন্য আমরা হারিয়ে যাই ভুলে যাই পৃথিবীতে মানুষের নিষ্ঠুরতা। এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। না হলে যে আমরা বাঁচতে পারব না। ঘন্টা খানিকের মতো পানিতে অবস্থান করি। ইঞ্জিন চালিত কোন শকট এখানে চলে না। তাই শব্দ দূষণ শূন্য। পর্যটকদের কন্ঠে সুর,পানির কলকল ধ্বনি আর পাখিদের কূজন কেবল কানে বাঁজে । এই পরিবেশে আমাকে একটা গান ধরতে আমার জায়া ফাহমিদার বারবার অনুরোধ। কত আর ফিরিয়ে দেয়া যায়। ধরলাম ওরে ও রসিক নাইয়া ওরে ও সুজন নাইয়া ভব সাগর পাড়ি দেওরে বেলা যায় যে বইয়া।
রাতারগুলের আয়তন ৩,৩২৫.৬১ একর। এর ৫০৪ একর বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। এছাড়া ২০৪.২৫ হেক্টর বনভুমি বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা। চিরসবুজ এই বন গোয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত এবং চেঙ্গির খালের সাথে একে সংযুক্ত করেছে। এখানে সবচেয়ে বেশি জন্মায় করচ গাছ (বৈজ্ঞানিক নাম: Millettia pinnata)। এখানকার গাছপালা বছরে ৪ থেকে ৭ মাস পানির নিচে থাকে। বর্ষাকালে এই বন ২০–৩০ ফুট পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে। বাকি সারা বছর, পানির উচ্চতা ১০ ফুটের মতো থাকে। বর্ষাকালে এই বনে অথৈ জল থাকে চার মাস। তারপর ছোট ছোট খালগুলো হয়ে যায় পায়ে-চলা পথ। আর তখন পানির আশ্রয় হয় বন বিভাগের খোঁড়া বিলগুলোতে। সেখানেই আশ্রয় নেয় জলজ প্রাণীকুল।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ফিরতে হবে এবার। সবাই বেশ ক্লান্ত। খিদেও কামড়ে ধরেছে পেট। গাড়িতে আমরা ফিরে আসি। পেছনে ফেলে আসি একরাশ মুগ্ধতা। ফাহমিদা চৌধুরীর হাতে রান্না করা খাবার সাথে করে নিয়েছিলাম। বসে খাওয়ার জায়গা খুঁজতে খুঁজতে চমৎকার এক জায়গার খোঁজ মেলে। অর্ধেক পথ পেরিয়ে রাস্তার পাশে বিরাট জায়গা নিয়ে এক মসজিদ। পাশে দু’টি বড় পুকুর। অনেকটা ছোট লেকের মতো। ওই পুকুরপাড়ে লিচু গাছের তলায় চাদর বিছিয়ে খাবারের পশরা সাজাই। বনভোজনের মতো কেউ দাঁড়িয়ে কেউ বসে খাবার উপভোগ করি। রাতারগুল ভ্রমনের এটিই শেষ দৃশ্য। এবার নিজ গন্তব্যের দিকে গাড়িতে চড়ে বসি। ছোট গল্পের মতো এই ভ্রমনের হয় শেষ, রেশ রবে চিরটা দিন।


আরও পড়ুন

সাবেক ছাত্রদল নেতা নাহিদ আর নেই

         সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ...